দুর্ঘটনায় গাড়িটা জখম হয়। অল্পের জন্য বেঁচে যায় ভূপেন, তার মেয়ে ললনা এবং ড্রাইভার কেশব। খানিকক্ষণ কেউ কথা বলতে পারে না।
ললনা থরথর করে কাঁপে।
রুমালে চশমা মুছে, মুখ মুছে ভূপেন জিজ্ঞাসা করে, এটা কীরকম ব্যাপার হল কেশব? তুমি তো কাঁচা ড্রাইভার নও?
কেশব বলে, সেই জন্যই বোধ হয় প্রাণে বেঁচে গেলাম আজ।
কেশবের নিজের তবে কোনো দোষ নেই। তার অবহেলা বা বিচ্যুতির ফলে দুর্ঘটনা ঘটেনি।
নইলে গাড়িটা এভাবে জখম করিয়েও সে এমন ঝাঁঝের সঙ্গে কথা কইতে পারে?
ললনা ঢোক গিলে বলে কী জন্য হল এ বকন?
স্টিয়ারি বিগড়ে গেল হঠাৎ।
তাই নাকি? ও।
আস্তে গাড়ি চালাই বলে রাগ করেন। জোরে চালালে আজ তিনজনে না মরলেও জখম হতাম। আমার মন বলছিল হঠাৎ গাড়ি বিগড়ে যাবে। একটা পুরানো রদ্দি মাল....
ললনা ভূপেনকে বলে, খুব তো বিশ্বাস করেছিলে সলিলবাবুকে। বন্ধুর ছেলে কী কখনও ঠকাতে পারে!
ভূপেন আপশোশ করে বলে, না, মানুষকে সত্যি বিশ্বাস নেই।
ভদ্রঘবের শিক্ষিত স্মার্ট ছেলে....
আপশোশ করে লাভ নেই। ভূপেন জরুরি কাজে বেরিয়েছে, যথাসময়ে যথাস্থানে তাকে গিয়ে পৌঁছতেই হবে। ললনা বেরিয়েছে সিনেমা দেখার জন্য, বাস্তায় তাকে সিনেমা হাউসটার সামনে নামিয়ে দেবার কথা। সিনেমা দেখাটা অবশ্য জরুরি কোনো কাজ নয়।
ললনা বলে, তুমি ট্যাক্সি করে চলে যাও বাবা। আমি বাড়ি ফিবে যাব। গাড়ির ব্যবস্থা আমরা করছি।
ভূপেন চলে গেলে ললনা বলে, আপনি তাহলে আমাদের প্রাণ বাঁচিয়েছেন?
নিজের প্রাণ বাঁচাতে।
গাড়ির ব্যবস্থা করার দায় কেশবের ঘাড়ে চাপিয়ে ললনা অনায়াসেই বাড়ি চলে যেতে পারত কিন্তু তখন গাড়িতে বসে সে কেশবের সঙ্গে কথা বলে।
তার নিজের সম্পর্কে, তার আপনজনদের সম্পর্কে ললনার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানাবিবরণ জানবার কৌতূহল গোড়ার দিকে বড়োই বিব্রত করত কেশবকে। মনে মনে বিরক্ত হত, রেগেও যেত। ক্রমে ক্রমে সে টের পেয়েছে ললনার দোষ নেই। তার মধ্যে এ কৌতূহল সৃষ্টি করেছে সে
নিজেই। বড়োলোকের একেলে স্মার্ট মেয়ে হোক, লেখাপড়া আর গান দুয়েই দখল থাক, শিক্ষিত মার্জিত নরনারীর আসর জমিয়ে দেবার বিশেষ ক্ষমতা থাক, তার যে একটা হৃদয আছে সেটা অস্বীকার করলে চলবে কেন।
বাড়ির মাইনে-করা ড্রাইভার হলেও জোয়ান মানুষটার অদ্ভুত ঘর টানের মানে জানবাব কৌতূহল সে হৃদয়ে জাগতে পারে বইকী।
সারাদিন ডিউটি দিয়ে কেশব প্রায় রোজ রাত্রেই গ্রাম্য শহরতলিতে তাব পুরানো ভাঙাচোবা নোংরা বাড়িতে ফিরে যায়।
শহরের শৌখিন এলাকায় ভূপেনের আধুনিক ফ্যাশানের নূতন রং করা বড়ো বাড়ি। গ্যারেজের লাগাও ড্রাইভাবের থাকবার ঘরটি ছোটো হলেও খোলামেলা ঝকঝকে তকতকে। প্রতিবছর বাডিটির আগাগোড়া চুন ফেরানো রং লাগানো হয়, কেশবের জন্য বরাদ্দ ঘরটিও বাদ যায় না।
স্টেশন পেরিয়ে সেই কতদূবে বোসপাড়া, সেখানে ইট-বার-করা নোনায়-ধরা সেকেলে দালানের ছোটো ছোটো ঘব, আলকাতরা-মাখানো ছোটো ছোটো জানালা দিয়ে ভালো আলো বাতাস খেলে না, ঘরের ভিতরটাও ভাঙাচোরা জিনিসপত্রে বোঝাই।
ও বকম একটা ঘরে রাত ক্যানণতে কষ্ট করে বাড়ি ফিরে যাওয়ার বদলে এখানে থাকলে রাত্রেব যাওয়াটাও কেশব পায়।
বাড়িব সেই একঘেয়ে শাক চচ্চড়ি কুচো চিংড়ির বদলে বড়োলোকেব বাড়ির আধুনিক বুচিকর পুষ্টিকর সুখাদ্য। কিন্তু দেখা যায়, পবিচ্ছন্ন ঘর ও সুখানের চেয়ে বাড়ির টানটাই কেশবেন ঢের বেশি জোরালো।
রাত বেশি না হলে স্টেশন পর্যন্ত ট্রাম-বাস পাওয়া যায়। কিন্তু স্টেশনের পাশ দিয়ে লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে গেলে আর ও সব বালাই নেই।
বোসপাড়া পর্যন্ত প্রায় এক মাইল রাস্তা তাকে হাঁটতে হয়। সেখানে ছোটোবড়ো নতুন পাকা বাড়ি আছে, বৈদ্যুতিক আলো আছে, সাজানো মনোহারি দোকান ও লন্ড্রি, হেয়ার-কাটিং সেলুন এ সবও আছে, কিন্তু আছে অপ্রধান হয়ে। প্রাধান্য সেখানে জরাজীর্ণ কাঁচা পাকা বাড়ির, গেঁয়ো সশঝাড়
ডোবা-পুকুরের সঙ্গে মেশানো শহুরে বস্তি খাটাল আর কাঁচা নর্দমার। বাগানবাড়ি আছে দুচারটা। কিছু লোকের ছোটোখাটো বাসভবনের লাগাও একবত্রি বাগানেও
শখের সুগন্ধি ফুল কিছু কিছু ফোটে। কিন্তু ফুলের গন্ধ হটিয়ে দুর্গন্ধই জাহির করে রাখে নিজেকে। তাছাড়া আছে মশা আর মাছি। দুয়েরই অখণ্ড প্রতাপ।
তবু কেশবের ফিরে যাওয়া চাই।
বিশেষ কাবণে রাত বেশি হয়ে গেলে ট্রাম-বাস মেলে না, কেশব হেঁটেই রওনা দেয়। ললনাদের বাড়ি থেকে স্টেশনও প্রায় আধমাইল রাস্তা।
ফিরে আসতে হয় খুব ভোরে। অনিমেষের তিয়াত্তর বছরের বুড়ি মা কে বোজ সকালে গ্যাব ঘাটে নিয়ে যেতে হয়।
কেশব বিয়ে করেনি।
অর্থাৎ আলোয় ঝলমল খোলামেলা পবিচ্ছন্ন এলাকায় সুন্দর বাড়িতে এমন সুবিধাজনক একটি ঘর থাকতে, ভালো খাওয়া পাওনা থাকতে, নিজের বাড়িতে আপনজনের মধ্যে শুধু কয়েক ঘণ্টা ঘুমোনোর জন্য ফিরে যাওয়া।
তার কী কোনো মানে হয়?
সেকেলে গেঁয়ো স্বভাবের একগাদা আপনজন। মা-বোন মাসি-পিসি ভাই ভাজদের যে সংসারে নিজে সে প্রায় পরের মতো হয়ে গেলেও যারা আজও তার আপনজন।
জখম গাড়িটাকে টেনে গ্যারেজে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা হলে ললনা বলে, চলুন না দুজনে সিনেমায় যাই? গাড়িটা যখন নেই, আমি গাড়ির মালিকের মেয়ে আর আপনি ড্রাইভার এ তফাতটাও এখন ভুলে যাওয়া যেতে পারে।
বোঝা যায়, এটা তার ঝোঁকের মাথায় হঠাৎ বলে-বসা প্রস্তাব নয়। এতক্ষণ তাকে জেরা করে করে আলাপ চালিয়ে যাবার সময় কথাটা মনে মনে নাড়াচাড়া করছিল।
কেশব আমতা আমতা করে বলে, ছুটি যখন পেয়ে গেলাম, বাডি ফিবব ভাবছিলাম।
ললনা আহত হয় না, বাগও করে না, আশ্চর্য হয়ে তাল মুখের দিকে তাকাস।
বলে, আমি শিগগির একদিন যাব আপনার বাড়িতে, দেখে আসব কী আছে সেখানে, বাডি যেতে আপনি এত পাগল কেন। সিনেমা দেখে বাড়ি গেলে চলে না
সিনেমা দেখতে আমার বিশ্রী লাগে।
বিশ্রী সিনেমা দেখতে যান বলে। বন্ধুবা কত টানাটানি করে আমি ও সব সস্তা সিনেমায় কখনও যাই দেখেছেন ?
কেশব স্নান মুখে একটা নিশ্বাস ফেলে বলে, একটা সত্যি কথা বললে বিশ্বাস করবেন? আমার বীরকম অস্থব অস্থির করছে মাদার মধ্যে যন্ত্রণা হচ্ছে।
ললনার মুখ দিলর্ণ দেখায়।
আপনার কি কোনো অসুখ আছে? আপনার চেহারা দেখে তো
কোনো অসুখ নেই। ডাক্তার তমতন্ন করে পরীক্ষা করেছে কোনো খুঁত খুঁজে পায়নি। কষ্ট যেটা হয সেটাও অদ্ভুত। মাথা গোবা নয়, এমনই যন্ত্রণা নয়, ভেতর।থেকে কী যেন চাপ দেয়। আত্মার এখন কী মনে হচ্ছে জানেন? কোথাও ছুটে পালাই।
এলনা প্রাণমুখে বলে, তাহলে বাড়িই যান।
কেশব চুপচাপ দাড়িয়ে একটু ভাবে।
হঠাৎ বলে, আচ্ছা চলুন তো সিনেমাতেই যাই আপনার সসো দেখি কষ্টটা কমে কি না। প্রশ্রয না দিয়ে এটাকে জয় করার চেষ্টা করা যাক।
খুব বেশি কষ্ট হলে
দেখি কা হয়।
দুজনে সিনেমাষ যায।
হাফ টাইম পর্যন্ত কোনো রকমে অপেক্ষা কবে কেশব বলে, আমি আব পাবছি না।
ললনা বলে থাক। আমিও আব দেখব না, ভালো লাগছে না। র. আপনার আসবাব দরকার হবে না।
তারপর বলে, আমি ট্যাক্সিতে বাড়ি ফিবব, সে পযন্ত আমান সর্গেই আসুন। তখন সন্ধ্যা উতবে গেছে। ভূপেনের আলোষ ঝলমল বাডিটার সামনে নেমে কেশব আবেকবার জিজ্ঞাসা করে, বাল তাহলে না এলে চলবে
ললনা বলে, কাল এসে কী করবেন গবে। পরশুর আগে বাবার সময় হবে না। এবার নিজেবা দেখে শান একটা নতুন গাড়ি কিনতে
ললনা এমনইভাবে কথা কয় যেন কেশবের মতো তাবৎ ভিতবে কিছু চাপ দিচ্ছে। কেশব ট্রামে স্টেশন পর্যন্ত যায়। স্টেশনের পাশে লেভেল ক্রসিংটা গাব হলেই শহবতলিব একেবাবে অন্যরকম চেহাবা।
বেলপথটা আলোয় ঝলমল বড়ো বড়ো অট্টালিকাব শহব আব নোংবা পুবানো জীর্ণ ঘববাডি আধো অন্ধকার শহবতলিকে পৃথক কবে বেখেছে। এ পাবে সীমা কর্পোবেশনেব, ও পাবে আবস্তু মিউনিসিপ্যালিটিব।
দুপুবে একপশলা বৃষ্টি হয়েছিল। ধুলো আব গোববে বাস্তাটা প্যাচপ্যাঁচ করছে। এখানে ওখানে গর্ত, সেগুলিতে জলেব বদলে জমেছে পাতলা তবল কাদা। তবু কী ভিড মানুষের।
শুধু ময়লা জামাকাপড়-পরা বা অর্ধ উলঙ্গ গরিব মানুষের ভিড় নয়। ফিটফাট বেশধারী বাবু মানুষ, স্যুটপরা সাহেব মানুষ এবং ভালো শাড়িপরা ভদ্রমহিলাও এই পথে হাঁটছে, দুপাশের দোকানে কেনাকাটা করছে। খানিক এগিয়েই সিনেমা। শো চলছে, ভিতরটা বোঝাই, তবু বাইরে গিজগিজ করছে সব বয়সের ভদ্রাভদ্র মেয়ে পুরুষ।
পরের শো-র টিকিটের প্রয়োজনে এত আগে এসে ধন্না দিয়েছে।
চেনা মানুষ শুধায়, আজ সকাল সকাল?
কেশব বলে, ছুটি পেয়ে গেলাম।
অফিস করা শ্রান্ত চেনা মানুষ মন্তব্য করে, তোমার তো ভাই আবামের চাকরি। পরের মোটরে চেপে বেড়াও, খেয়ে-দেয়ে খাটিযায় শুয়ে নাক ডাকাও।
কেশব মুখ বাঁকায়।
করে দেখলে আরাম টের পাওয়া যায়। বাবু হুকুম দেবে, জোরসে চালাও। জোরসে চালিয়ে মানুষ চাপা দিয়ে তুমি শালা মার খাও আর জেলে যাও। কত আরাম!
এগোতে এগোতে আরও কমে আসে রাস্তার আলোর জোর, দোকানপাটের দেখা মেলে দূরে দূরে, বাড়িগুলির গ্রাম্যতা আর জীর্ণতা বেডে যায়। এবড়ো-খেবড়ো খোয়ায় তৈরি এই প্রধান রাস্তা থেকে দুপাশে পাড়ার মধ্যে ঢুকে গেছে ইটের গলিগুলি। বাগদিপাড়ার ফাঁকা জায়গায় বাজারটা খাঁ-খাঁ করছে দেখা যায়। এখানে সকালে একবেলা বাজার বসে।
বোসপাড়ার মোড়ে বিবর্ণ থামটার মাথায় টিমটিম করে জ্বলছে একটা অল্প পাওয়ারের বালব। এ যেন বাঁশঝাড় ডোবা-পুকুর এলাকার মানুষগুলিকে জানিয়ে দেওয়া বৈদ্যুতিক আলো জ্বললেই কা এসপ্ল্যানেডের মতো আলোয় ঝলমল করে?-এটাও বৈদ্যুতিক বাতি, এদিকে তাকিয়ে ঘরের ডিবরি আর লণ্ঠন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো।
সন্ধ্যাদীপ জ্বালো ভেজাল তেল দিয়ে, ছেঁড়া ন্যাকড়ার সলতে পাকিয়ে। সে আলোতে শান্তি আছে, স্নিগ্ধতা আছে! এটা তো নিছক কাচের খেলনার আলো।
কেশব একটু দাঁড়ায়। এখন মনে হয়, কত দূরে যেন ভেসে এসেছে লেভেল কসিংয়ের ও পাবে ললনাদের শহর, মন থেকে যেন প্রায় মুছে গেছে চোখ-ঝলসানো আলো, শহবের জমকালো রূপ আর গাড়ি ও মানুষের কলরব।
সে-ও ওই ধোঁকাবাজিতে বিশ্বাস করে-সভ্য জগতের সভা জীবনের কোলাহল থেকে দূরে পালিয়ে শান্তি ও স্নিগ্ধতা খোঁজার ধোকাবাজিতে। নইলে ললনার অত আগ্রহ সত্ত্বেও সিনেমা শো-টা শেষ পর্যন্ত না দেখে কীসের আকর্ষণে সে ছুটে এল এই আধা-অন্ধকার ডোবার সোঁদল দুর্গন্ধে ভারী বাতাসের গেঁয়ো এলাকায় ?
শরতের মনোহারি ও মুদিখানা মেশানো দোকানের বাল্বটা জোরালো আলোই দেয়। কেশব দোকানে দুপয়সাব নস্য কিনতে যায়।
নস্য দিয়ে শরৎ তার হাতে একটা ঠোঙা দেয়, বলে, গুড়টা বাড়িতে পৌঁছে দেবে? ছোঁড়াছুঁড়িগুলি কী মিষ্টিটাই খেতে পারে।
প্রৌঢ় শরতের মুখে একটা শান্ত নিবৃত্তেজ ভাব, জীবনে তার যেন কোনো রসকষ নেই। স্থানীয়
স্কুলে বাংলা পড়ায় আর এই দোকানটা চালায়, নীরস একঘেয়ে হয়ে গেছে তার জীবনের লড়াই। শরতের দোকানের পাশ দিয়ে কেশব দক্ষিণ দিকে বোসপাড়ার রাস্তায় ঢোকে। বোসপাড়ায় ছাড়া ছাড়া থোক থোক ঘন বসতি। কাছাকাছি ঘেঁষাঘেঁষি হয়তো আট-দশটি বাড়ি, তার পরে খানিকটা ফাঁকা মাঠ পুকুর বাগান ঝোপ জঙ্গল।
বড়ো বড়ো বাড়িগুলি আর নতুন যে বাডি উঠেছে সেগুলিই কেবল পুরানো বাড়ির কোনো একটা কোণে না ঘেঁষে কমবেশি তফাতে তফাতে দাঁড়িয়ে আছে।
শহরে এখন রাত বেশি হয়নি। আলো নিভিয়ে বোসপাড়া ঘুমিয়ে না পড়লেও অনেকটা নিঝুম হয়ে এসেছে, রাস্তায় লোক খুব কম। মাঝে মাঝে কোনো দাওয়ায় বসেছে কয়েকজনের আড্ডা, কোনো বাড়ি থেকে শোনা যাচ্ছে ছেলেমেয়ের চেঁচিয়ে পড়া, মুখস্থ করা, দু-একটা বাড়িতে আবার কিন্তু রেডিয়ো বাজছে।
প্রকাণ্ড বটগাছটার লাগাও সাদা চুনকাম করা চৌকো একতলা বাড়িটা আবছা আঁধারে বড়োই রহস্যময় দেখায়, সংলগ্ন আটচালা দুটো সে রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে। ভিতরে আলো জ্বলছে, মানুষের গলার আওয়াজ বহিরে ভেসে আসছে, নাকে এসে লাগছে রান্নাঘবের সম্বরার গন্ধ। তবু তারাভরা নীলাকাশ যেমন প্রকাশ্য হয়েও রহস্যময়, বৈশাখী গুমোট সন্ধ্যায় নিথব জমকালো বটগাছটা যেমন জীবস্ত হয়েও মৃতের মতো ভয়ের রহস্যে ঘেরা, তেমনই সাধাবণ ইটের বাড়িটির ছায়াচ্ছন্ন শুভ্রতা যেন ছায়ালোকের প্রতীকের মতো রহস্যানুভূতিকে নাড়া দেয়।
দালানটার ভিতরে ছোটো একটু উঠান আছে। এদিকে বেড়ায় ঘেবা বাগান। মাচা আছে তিনটি, লাউ কুমড়ো আর উচ্ছে গাছের। কয়েকটা জবাগাছে ফুলও ফোটে।
বান্না হয় দালানের একটু তফাতে কাঁচা চালাঘরে।
দালানের ভিতরে না গিয়ে বাগান দিয়ে রান্নাঘরে যাওযা যাষ।
মায়া উনানে তরকারি চাপিয়ে শরতের ছেলে গণেশের গায়ের ঘামাচি মারছিল, কেশবকে দেখে তার মুখে একটু অদ্ভুত রকম শান্ত আর মিষ্টি হাসি ফোটে।
কেশব বলে, শরৎদা গুড় পাঠিয়েছে।
গুড়ের ঠোন্ডাটা বেখে মায়া গণেশের চিবুকে চুমু খেয়ে বলে, এবাব পড়বে যাও তো মানিক। আব পাহারা দিতে হবে না।
দালান কাছেই, মানুষ কথা বললে শোনা যায় কিন্তু সন্ধ্যার পর নলাঘরে একা রাঁধতে মায়ার ভয় করে। একজনকে তার সঙ্গে থাকতে হয।
চালার এপাশে কাছাকাছি আর বাড়ি নেই, গাছপালা জঙ্গল আর পুকুর। তার ওদিকে কেশবের বাড়ি।
কেশব তামাশা করে বলে, সন্ধ্যারাতে এত ভয়?
মায়া বলে, ভয় করবে না? ওই আঁধার জঙ্গল, গণেশ ছিল তবু গা-টা ছমছম করছিল। বছরখানেক আগেও ডিবরি জ্বলত এ ঘবে, আজকাল শালের খুঁটির গায়ে বসানো ল্যাম্প আলে। দেয়।
মায়া বলে, মুখ শুকনো দেখছি? খুব খাটিয়েছে বুঝি আও না, সারা দুপুর ঘুমিয়েছি।
তবে ?
একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল। অল্পের জন্যে বেঁচে গেছি।
ল্যাম্পের রঙিন আলোয় ঠিক বোঝা যায় না কী রকম পাংশু বিবর্ণ হয়ে গেছে মায়ার মুখ। চোখে পলক নেই আর ঠোঁট ফাঁক হয়ে আছে দেখে অনুমান করা যায় সে কী রকম ভড়কে গেছে। মায়া রূপসি কিনা ব-ণ কঠিন। তবে তেল-চকচকে একরাশি কালো চুলে ঘেরা শ্যামল রঙের মুখখানায় তার লাবণ্য ঢলঢল করছে। সস্তা তাঁতের শাড়িটাই যেন তাকে ভালো মানিয়েছে।
কেশব হেসে বলে, কী হল?
মায়া ঢোক গেলে।
চাপা সুরে বলে, ওই আবার কালী আসছে। দুদণ্ড ভালো করে কথা কইবার উপায় নেই।
শরতের মেয়ে কালীর বয়স বছর এগারো, এই বয়সেই সে ইজের ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরেছে। ডুবে শাড়ির আঁচল লুটিয়ে বেণি দুলিয়ে এসে কেশবের দিকে বাঁকা চোখে চেয়ে সে মায়ার কাছে আবদার জানায়, খিদে পায় না, ঘুম পায় না মাসিমা? কত রাঁধবে তুমি?
মায়া ঝংকার দিয়ে বলে, বান্না বাকি আছে নাকি আমার? এবার তরকারি নামাব। ডেকে আন গে সবাইকে, ঠাঁই করে নিয়ে বোস। লণ্ঠন আনিস।
ভাইবোনদের ডেকে আনতে কালী দালানের মধ্যে অদৃশ্য হতেই মায়া চট করে কাছে এসে বলে, বুকটা ঢিপঢিপ করছে। এ কাজ ছাড়তে হবে তোমাকে। কী হয়েছিল সব যতক্ষণ না শুনচি বুকের কাঁপুনি যাবে না। এক কাজ করো, জামাকাপড় ছেড়ে এসে দালানে সবাইকে বলবে ঘটনা কী হয়েছিল, আমিও শুনব। কালী ছুঁড়ি দেখে গেল, বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে কথা কইলে দিদি আবার ঝাড়বে।
কেশব বাগান দিয়ে ঘুরে রান্নাঘরে এসেছিল এবাব সে দালানে ভিতর দিয়ে ফিরে যায়।
দালানের ভিতরে বারান্দায় শরতের বড়োছেলে রঞ্জন পড়ছিল, কেশবকে দেখে সে বলে, কেশবদা কোন দিক দিয়ে এলে?
কেশব বলে, শবৎদা ঠোঙায় গুড় দিয়েছিল, বান্নাঘবে মায়াকে দিয়ে এলাম।
ঘর থেকে অবলা জিজ্ঞাসা করে, কেশব নাকি? বসবে না?
অবলার হয়েছে পক্ষাঘাত। আজ বছর তিনেক দিবারাত্রি তার বিছানায় শুয়ে কাটছে। সেটাই বোনকে আনিয়ে কাছে রাখার কারণ, তাব আধ-ডজন ছেলেমেয়ের সংসাবটা মায়াকে দেখাশোনা করতে হয়।
কেশব বলে, আজ একটা অ্যাকসিডেন্ট ঘটে মবছিলাম প্রায়। জামাকাপড় ছেড়ে এসে বলছি ব্যাপার।
কেশবের বাড়িতে অনেক লোক। তার বিধবা মা, তিন ভাই, দুটি বোন, মেজোভাষের বউ, তার দুটি বাচ্চা ছেলেমেয়ে, একজন পিসি ও তার ছেলে।
ছোটো ছোটো কুঠরি আছে অনেকগুলি। কেশব একা একখানা ঘর দখল করলেও ঘাবের জন্য অসুবিধা হয় না। তবে কেশবের সেজোভাই প্রণব এবং পিসির ছেলে ভোলাব বিয়ে হলে ঘরেল টানাটানি পড়বে।
পিসি পারলে রাত পোহালেই ছেলের বিয়ে দেয়। কেশনের ভয়ে কিছু করতে পাবে না। কে জানে কীরকম বিবেচনা কেশবের। ব্যাটাছেলে তো রোজগার করবেই একদিন চাকরি পেয়ে হোক, ফিরিওলাগিরি কুলিগিরি করেই হোক। পাকাঘরে দুধে-ভাতে কিংবা কুঁড়েতে আধপেটা শাকভাত খেয়ে জীবন কাটাবে, যেমন অদৃষ্টে আছে।
কিন্তু বয়স গেলে যে বিষে করার সুখটাই নষ্ট হয়ে গেল জীবনে? দুদিনের জন্য হলেও এই তো বয়স বিয়ের, আসল রস আর আনন্দ পাবার।
জীবনটাই তো অস্থায়ী মানুষের।
কেশবের নিজের ফসকে গেছে কিনা, অন্যের জীবনে এ রস আর আনন্দের কোনো দাম তার কাছে নেই।
শহর থেকে এটা-ওটা আনার ফরমাস ছিল দু-তিনজনের। বিমলা জিজ্ঞাসা করে, খালি হাতে এলি, পাটি আনিসনি তো?
কেশব বলে, না। আমি বলে অ্যাকসিডেন্ট হয়ে মরছিলাম-
মাগো! বলিস কী রে? ভগবান দীনবন্ধু!
ফরমাশি জিনিস না আমার জন্য যারা অনুযোগ দেবার জন্য উদ্যত হয়েছিল তারা একেবারে চুপ করে যায়।
সংক্ষেপে ঘটনার বিবরণ জানিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে কেশব পুকুরে গিয়ে স্নান করে আসে। তাড়াতাড়ি না যাওযাই ভালো। আধ-ডজন ছেলেমেয়েকে খেতে বসিয়েছে, ওরা খেয়ে না উঠলে মায়া এসে শুনতে পাবে না তার দুর্ঘটনার কাহিনি।
অনেকটা দেরি করে গিয়ে সে দেখতে পায়ে শরৎ ইতিমধ্যে দোকান বন্ধ করে বাড়ি এসেছে। সে বলে, অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে নাকি শুনলাম? তুমি যে বাড়ি সুদ্ধ আমাদের ভাবিয়ে রেখে গেলে। মাদুর পেতে তাকে বসতে দেওয়া হয়।
ঘর থেকে অবলা বলে, একটু জোরে জোবে বলো কেশব। তোরা কেউ টু শব্দটি করবি না।
কেশব দুর্ঘটনার কথা বলে যায়, শরতের চার বছরের ছেলেটাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়াতে
পাড়াতে মাযা কাছে বসে শোনে।
লণ্ঠনের আলোয় বিবর্ণ মুখ দিয়ে অস্ফুট ভয়ের আওয়াজ বাব হয়।
তার কাহিনি বলা শেষ হলে অবলা বলে, তবু ভাগ্যি।
মায়া ঙ "ব, হাত-পা জখম হতে পারে, প্রাণ যেতে পারে, এমন কাজ না করলেই হয়। কাজ না করলে খাব কী?
আার কী কাজ নেই জগতে ?
যে কাজ জানি সেটাই করছি। অ্যাকসিডেন্ট হয় বলে লোকে মোটব হাঁকাবে না?
এত দরদ এত সহানুভূতি নিজের বাড়িতে এবং এই পরেব বাড়িতেও! তবু যেন আব প্রাণটা ভরতে চায় না কেশরের। কেমন বিস্বাদ হয়ে যায় সব কিছু।
বাড়ি যাওয়ার সময় যেন ওজন আরও বেড়ে গেছে মনে হয় বিষাদ ও অবসাদেব। আরও নিঝুম হয়ে গেছে বোসপাড়া, ঘরে ঘরে জীবনকে গুটিয়ে নিয়েছে মানুষ। কীসেব টানে সে ছুটে এসেছিল ব্যাকুল হয়ে এত শান্ত ও রিক্ত চারিদিকের জীবন এখানে। এই বিষাদ আর অবসাদ নিয়ে সহজে ঘুম আসবে না, ভোঁতা রাত্রি জেগে শুনবে ঝিঁঝির ডাক।
খেয়ে উঠে কেশব নিজের ঘরে যায়। ঘবেবটি ছাড়া বাড়ির অন্য আলো এবং শবতেব বাড়ির আলো প্রায় একসময়েই নিভে যায়।
আলো হয়তো জ্বালা আছে কোনো কোনো বাড়িব ঘবে কিন্তু সে আলো জ্বলছে অন্য প্রয়োজনে,
তার মতো ঘুম আসে না বলে অগত্যা কিছু পড়ার জন্য আলো জ্বালিয়েছে কজন? জঙ্গলের দিকের জানালার বাইবে থেকে মায়াব চাপা গলাব কথা শুনে কেশব চমকে যায়! শুনছ? একটা কথা শোনো?
মায়া তুমি?
আলোটা নিভিয়ে দাও।
কেশব আলো নিভিয়ে জানলার কাছে সরে। যে জিজ্ঞাসা করে, তুমি এই জঙ্গল দিয়ে একা
এলে ?
কী করব? তুমি তো রাত থাকতে উঠে কাজে চলে যাবে।
কাল আমার ছুটি। তোমার ভয় করল না?
করল বইকী। বড়ো দয় দিয়ে ছোট্ট ভয় ঠেকিয়ে চলে এলাম। কেশব একটু ভেবে বলে, ঘরে আসবে? না আমি বাইরে যাব? মায়া বলে, তুমি যা বলো।
থাক, আমিই আসছি। কে কোন ঘর থেকে দেখে ফেলবে ঠিক নেই। আমায় যেতে দেখলে ভাববে ঘাটে যাচ্ছি।
খিড়কি খুলে কেশব বেরিয়ে যায়। কিছু তফাতে সরে গিয়ে তেঁতুলগাছটার তলায় গাঢ় অন্ধকারে তারা দাঁড়ায়।
কী ব্যাপার মায়া?
আমি থাকতে পারলাম না। আমার দম আটকে আসছিল। আমায় কথা দাও এ কাজ তুমি ছেড়ে দেবে।
টের পাওয়া যায় মায়া কাঁদছে।
কেশব নিশ্বাস ফেলে বলে, তুমি এত অস্থিব হচ্ছ কেন? গাড়ি মেরামত হতে গেছে, কাল দিনটা আমার তো ছুটি।
কান্না থামিয়ে মায়া বলে, ও।
তারপর উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করে, তুমি বিবক্ত হলে মনে হচ্ছে?
পাগল। তুমি আমাকে অবাক করে দিয়েছ। চলো তোমায় এগিয়ে দিয়ে আসি।
আবছা ভোরে কেশব পুকুরে গিয়ে নেয়ে উঠে ঘাটে দাঁড়িয়ে পা মুছছে, মায়া একটা গ্লাস হাতে কবে এসে বলে, চট করে চুমুক দিয়ে খেয়ে ফেলো।
গ্লাসে একপোর বেশি দুধ।
এ আবার কী ব্যাপার?
যে গাইটা বিইয়েছিল, আজ থেকে তার দুধ খাওয়া হবে। রোজ খানিকটা টাটকা দুধ খেতে হলে
তোমায়।
কেশব বলে, সে তো বুঝলাম, কিন্তু দুধ কম পড়লে বাড়িতে কী বলবে?
মায়া হেসে বলে, কত খেয়াল রাখছে বাড়ির লোক। গাইটাও তো দুইতে হবে আমাকেই। পেয়ে নাও, কে কোথা থেকে দেখবে।
অগত্যা দুধের গ্লাসে কেশবকে চুমুক দিতে হয়। বাচ্চা বাচ্চুর, দুধ খুব পাতলা। কিন্তু ঠিক সে জন্য যেন নয়। মায়ার এই গায়ে পড়ে দরদ করার জন্যই যেন তার লুকিয়ে আনা দুধটা বিশেষ বকম বিস্বাদ লাগে কেশবের কাছে।
এত ভোরে নাইছ কেন?
শহরে যাব।
আজ না তোমার ছুটি?
অন্য কাজে যাব।
এটা বানানো কথা। কেশবের কাজ কিছুই নেই।
ভিতরটা অস্থির হয়ে উঠেছে শহরে যাবার জন্য তাই কেশবকে যেতে হবে। সে অনুভব করে ভিতরে কী যেন প্রচণ্ডভাবে চাপ দিচ্ছে, মনে হচ্ছে পাগলের মতো ছুটে চলে যায় লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে শহরের দিকে। কর্মব্যস্ত শহরের কলরব কানে না এলে, দামি ফুলের বাগান ও লনের ধারে গ্যারেজের পাশে তার পরিচ্ছন্ন ঘরখানায় বসে বাড়ির ভিতর থেকে ললনার গানের সুর ভেসে আসা না শুনলে তার যেন দম আটকে যাবে।
কিন্তু কেশব জানে, সারাদিন পর আবার সে পাগল হয়ে উঠবে আলোকোজ্জ্বল শহর থেকে এই অন্ধকার বোসপাড়ায় ফিরে আসার জন্য। লেভেল ক্রসিংয়ের দুটি দিক পালা করে তাকে কাছে টানবে আর দূরে ঠেলে দেবে।